মহাকাশ জয়ের ৫৪ বছর

মহাকাশ জয়ের ৫৪ বছর

মানুষের মহাকাশ জয়ের ৫৪ বছর পূর্ণ হলো। সর্বপ্রথম মহাকাশ ভ্রমণ করেন সোভিয়েত বৈমানিক ইউরি গ্যাগারিন। তিনি ভস্টক-১ নভোযানে করে ১৯৬১ সালের ১২ এপ্রিল পৃথিবীর কক্ষপথ প্রদক্ষিণ করেন। গ্যাগারিন স্থানীয় সময় সকাল ৯টা ৭মিনিটে তিনি পাড়ি দেন। সেখানে তিনি ১০৮ মিনিট ছিলেন। সকাল ১০টা ৫৫মিনিটে পৃথিবীপৃষ্ঠে ফিরে আসেন। মানব সাফল্যের উদাহরণ হিসাবে সঙ্গত কারণেই ১২ এপ্রিল ইতিহাসে অবিস্মরণীয়। আর গ্যাগারিনও বিশ্ব মানবের মাঝে চির স্মরণীয়।

জয়ের ৫৪ বছর১৯৬০ সালে বিভিন্ন অনুসন্ধান এবং নির্বাচন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ২০ জন বৈমানিককে সোভিয়েত মহাকাশ কর্মসূচির জন্য পছন্দ করা হয়। ইউরি গ্যাগারিন ছিলেন তাদেরই একজন। চূড়ান্তভাবে গ্যাগারিনকেই তার কার্যক্ষম এবং শারীরিক বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় পছন্দ করা হয়।

ভস্টক ককপিটে জায়গার পরিমাণ খুবই কম। ফলে ব্যক্তিকেই অবশ্যই খাটো আকৃতি হতে হবে। গ্যাগারিন লম্বা ৫ ফুট ২ ইঞ্চি ছিলেন, যা ছোট ভস্টক ককপিটের জন্য সুবিধাজনক। গ্যাগারিন তার সহকর্মীদের কাছেও জনপ্রিয় ছিলেন। যখন ২০ জন প্রার্থীকে একে অন্য প্রার্থীর জন্য ভোট দিতে বলা হলো যে, তারা কাকে প্রথম ভ্রমণে দেখতে চান, তিন জন বাদ দিয়ে বাকি সবাই গ্যাগারিনকে পছন্দ করেছিলেন।

মহাকাশে পৃথিবী থেকে ১৭৭ কিলোমিটার দূর থেকে একাকী গ্যাগারিনের মহাকাশের ১০৮ মিনিটের কক্ষপথ ভ্রমণ ছিল চরম দুর্দশাপূর্ণ। `ভস্টক-১` মহাকাশ যানটির ন্যাভিগেশানাল নিয়ন্ত্রণ পর্যন্ত ছিল না। চরম সাহসের সঙ্গে তিনি সেই পরিস্থিতির মোকাবিলা করেন।

এই মহাকাশ ভ্রমণে ২৭ বছর বয়সেই গ্যাগারিন আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেন। তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের নায়কে পরিণত হন। এ জন্যে বহু পুরস্কার এবং পদক লাভ করেন। গ্যাগারিনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তার মুখের হৃদয় জয় করা হাসি। ট্র্যাজেডি এই যে, ১৯৬৮ সালের ২৭ মার্চ গ্যাগারিন মিগ-১৫ ইউটিআই বিমান দুর্ঘটনায় নিহত হন।

অবশ্য গ্যাগারিনে আগে ১৯৪৪ সালে মহাকাশ থেকে ঘুরে এলো জার্মানির মহাকাশযান এ-৪। কিন্তু ওটাতে কোনো প্রাণীই ছিলো না। তবে চল্লিশের দশকেই মহাকাশযানের সঙ্গে বিভিন্ন প্রাণীকেও পাঠানো শুরু হলো। ১৯৪৭ সালে আমেরিকা ভি টু রকেটে পাঠালো কতোগুলো ফলের মাছিকে। এরপর ১৯৪৯ সালে পাঠালো ‘আলবার্ট’নামের এক বানরকে। কিন্তু মহাকাশে পৌঁছার আগেই মারা গেল আলবার্ট। আর তার জবাব দিলো রাশিয়া লাইকা` নামে কুকুর পাঠিয়ে।

এ জবাবে আমেরিকা পাঠাল ‘আব্ল’ আর ‘বাকের’ নামের দুই বানর। এই প্রথম মহাকাশ ঘুরে জীবিত ফিরে এলো কোন প্রাণী। মার্কিন রকেট জুপিটার এএম১৮-তে করে ওরা ঘুরে এল মহাকাশ থেকে। আর সেই সঙ্গে বিজ্ঞানীরাও চিন্তা-ভাবনা শুরু করলেন, এবার তবে মানুষই ঘুরে আসুক মহাকাশ থেকে।

আমেরিকা আর রাশিয়ার পাল্টাপাল্টিতে এবার জয়ী হলো রাশিয়া। ‘ভস্টক- ১’ তৈরি হতে লাগলো মহাকাশে প্রথম মানবকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। সোভিয়েত স্পেস প্রোগ্রামের ২০ জন পাইলটকে নিয়ে শুরু হলো স্পেস ট্রেনিং প্রোগ্রাম। আর শেষমেশ তা গিয়ে দাঁড়ালো দুইজনের প্রতিযোগিতায় ‘ইউরি গ্যাগারিন আর গেরমান তিতোভ’র। কিন্তু শেষপর্যন্ত টিকে গেলেন গ্যাগারিন-ই।

১২ এপ্রিল, ১৯৬১। ইউরি গ্যাগারিনকে নিয়ে রওয়ানা হলো ভস্টক-১। মানুষের ইতিহাসে প্রথম কোনো মানুষ পৃথিবী ছেড়ে বাইরে গেলেন, গেলেন মহাকাশে। পৃথিবী ছাড়িয়ে মহাকাশেও মানুষ তার রাজত্ব বিস্তার করলো। মহাকাশ পদানত হলো মানুষের কাছে।

১১৮ মিনিট ধরে বিশ্বের প্রথম মহাকাশ ভ্রমণ শেষ করে ইউরি গ্যাগারিন আবার পৃথিবীর বুকে পা রাখলেন। উজ্জ্বল কমলা রঙের স্পেসস্যুট গায়ে, মাথায় সাদা রঙের হেলমেট, আর পিছে এক বিশাল প্যারাস্যুট নিয়ে মাটিতে নামলেন ইউরি গ্যাগারিন, বিশ্বের প্রথম মহাকাশচারী।

Share This Post

Post Comment